আমাদের চারপাশের দুনিয়াটা আসলে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। একটা হলো ক্লাসিক্যাল দুনিয়া, যেটা আমরা রোজ দেখি, ছুঁতে পারি। আর অন্যটা হলো কোয়ান্টাম দুনিয়া, যেটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সবকিছুর মূলে লুকিয়ে আছে। এই কোয়ান্টাম দুনিয়ার নিয়মগুলো সাধারণ ক্লাসিক্যাল নিয়ম থেকে একদম আলাদা। সেখানেই শুরু হয় কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের গল্প।

সাধারণ কম্পিউটারে আমরা যে ডেটা ব্যবহার করি, সেগুলো হয় ০ অথবা ১। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটারে এই ০ আর ১ ছাড়াও আরেকটা অবস্থা থাকতে পারে, যাকে বলে সুপারপজিশন। মানে, একটা কোয়ান্টাম বিট (কিউবিট) একই সাথে ০ এবং ১ দুটো অবস্থাতেই থাকতে পারে। চিন্তা করে দেখুন, যদি একটা কয়েন একই সাথে হেড আর টেল দুটো অবস্থাতেই থাকে, তাহলে কেমন হবে! এই সুপারপজিশনের কারণেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার এত শক্তিশালী।

এবার আসি এনট্যাঙ্গলমেন্টের কথায়। এটা কোয়ান্টাম দুনিয়ার আরেকটা অদ্ভুত জিনিস। দুটো কিউবিট যদি এনট্যাঙ্গলড হয়ে যায়, তাহলে তাদের মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক তৈরি হয়, যা দূরত্ব দিয়ে মাপা যায় না। একটা কিউবিটের অবস্থা বদলালে, অন্য কিউবিটও সাথে সাথে বদলে যায়। আইনস্টাইন এটাকে “স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট এ ডিস্টেন্স” বলতেন।

এই সুপারপজিশন আর এনট্যাঙ্গলমেন্টকে কাজে লাগিয়েই কোয়ান্টাম কম্পিউটার জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারে, যা সাধারণ কম্পিউটারের পক্ষে অসম্ভব। যেমন, ধরুন, কোনো একটা জটিল মলিকিউলের গঠন বের করা। সাধারণ কম্পিউটার এই কাজটা করতে কয়েক হাজার বছর লাগিয়ে দিতে পারে, কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার হয়তো কয়েক মিনিটেই করে ফেলতে পারবে।

কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানানো খুব সহজ নয়। এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ডিকোহেরেন্স। মানে, বাইরের কোনো কিছুর প্রভাবে কিউবিটগুলো তাদের কোয়ান্টাম অবস্থা হারিয়ে ফেলে। আর একবার যদি ডিকোহেরেন্স হয়ে যায়, তাহলে আর হিসাবটা ঠিক থাকে না। এখানেই মাইক্রোসফটের মেজরানা ১ চিপের গুরুত্ব।

ভাবুন তো, একটা এমন কম্পিউটার যা আমাদের চারপাশের দুনিয়াটাকে একদম বদলে দিতে পারে? এমন একটা যন্ত্র, যা জটিল সমস্যার সমাধান নিমেষেই করে দিতে পারে, এমন কিছু আবিষ্কার করতে পারে, যা আগে কেউ ভাবতেও পারেনি। হ্যাঁ, আমি কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কথাই বলছি। আর মাইক্রোসফট নিয়ে এসেছে এমন একটা চিপ, যা এই স্বপ্নটাকে সত্যি করার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে।

গল্পটা শুরু হয় অনেক দিন আগে। বিজ্ঞানীরা যখন বুঝতে পারলেন, আমাদের চারপাশের দুনিয়াটা আসলে কোয়ান্টামের নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু এই জটিল নিয়মগুলোকে কাজে লাগিয়ে কিছু তৈরি করা খুব সহজ নয়। বছরের পর বছর ধরে তারা চেষ্টা করে গেছেন, এমন একটা কম্পিউটার বানানোর, যা কোয়ান্টামের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারবে।

তারপর এল মাইয়োরানা ১ চিপ। নামটা একটু জটিল, তাই না? কিন্তু এর কাজটা দারুণ সহজ। এই চিপটা তৈরি হয়েছে একদম অন্যরকম একটা পদ্ধতিতে। এখানে সাধারণ কিউবিটের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে টপোলজিক্যাল কিউবিট। ভাবুন তো, একটা দড়ির কথা। দড়িটাকে যতই প্যাঁচান না কেন, তার দুটো মাথা কিন্তু সবসময় একই থাকবে। ঠিক তেমনই, এই টপোলজিক্যাল কিউবিটগুলো খুব স্থিতিশীল। ফলে, এদের মধ্যে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম।

এই স্থিতিশীলতাই মাইয়োরানা ১ চিপের আসল শক্তি। মাইক্রোসফট বলছে, এই চিপের মাধ্যমে তারা এক মিলিয়ন কিউবিট পর্যন্ত তৈরি করতে পারবে। এক মিলিয়ন! ভাবতেই অবাক লাগে, তাই না? এতদিন পর্যন্ত কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল এর স্কেলিং। মানে, এদের আকার বাড়ানো। কিন্তু এই নতুন চিপ সেই সমস্যার সমাধান করতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই চিপ দিয়ে কী হবে? কল্পনা করুন, এমন একটা কম্পিউটার, যা নিমেষেই নতুন ওষুধ আবিষ্কার করতে পারে। এমন উপাদান তৈরি করতে পারে, যা আগে কখনও সম্ভব ছিল না। এমন সব সমস্যার সমাধান করতে পারে, যা এখন আমাদের কাছে অসম্ভব মনে হয়।

যেমন, ধরুন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের কথা। ছোট ছোট প্লাস্টিকের কণা, যা আমাদের পরিবেশকে দূষিত করে চলেছে। মাইয়োরানা ১ চিপের সাহায্যে আমরা এমন এনজাইম তৈরি করতে পারি, যা এই প্লাস্টিকগুলোকে সহজেই ভেঙে দিতে পারবে। বা ধরুন, জলবায়ু পরিবর্তনের কথা। এই চিপের মাধ্যমে আমরা এমন মডেল তৈরি করতে পারি, যা আমাদের আবহাওয়ার পরিবর্তনগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।

শুধু তাই নয়, এই চিপ সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বিপ্লব আনতে পারে। আজকের জটিল ক্রিপ্টোগ্রাফি সিস্টেমগুলো কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কাছে ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু মেজরানা ১ চিপের সাহায্যে আমরা এমন ক্রিপ্টোগ্রাফি তৈরি করতে পারি, যা কোয়ান্টাম কম্পিউটারও ভাঙতে পারবে না।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, মাইয়োরানা ১ চিপ শুধু একটা চিপ নয়, এটা একটা সম্ভাবনার দরজা। এমন একটা দরজা, যা খুললে আমাদের সামনে এক নতুন দুনিয়া অপেক্ষা করছে। যে দুনিয়ায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং আমাদের জীবনযাত্রা সবকিছুই বদলে যাবে।

এই ছিল মাইক্রোসফটের মাইয়োরানা ১ চিপের গল্প। আশা করি, আপনারা সবাই বুঝতে পেরেছেন, এই আবিষ্কার কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের দুনিয়ায় এটা সত্যিই একটা নতুন সকাল।

Leave a comment

Trending